সোমবার, ২৯ Jun ২০২৬, ০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন
আবার যখন সিনেমা হলে মানুষের জোয়ার নেমেছে, তখনই সে জোয়ার বন্ধ করার ‘ষড়যন্ত্র নিয়ে অশুভ শক্তি’ মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচিত সিনেমা ‘হাওয়া’র পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের বিরুদ্ধে মামলা এবং সিনেমার প্রদর্শন বন্ধে উকিল নোটিস পাঠানোর ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ অভিনয় শিল্পী সংঘ। গত মঙ্গলবার সংগঠনটির সভাপতি আহসান হাবীব নাসিম ও সাধারণ সম্পাদক রওনক হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নাটক নির্মাতা অনন্য ইমনের বিরুদ্ধে মামলারও নিন্দা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমাদের সংস্কৃতিচর্চার পথ রুদ্ধ করার সব অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার জন্য আমরাও বদ্ধপরিকর।’ সাড়া জাগানো হাওয়া সিনেমায় শালিক পাখিকে খাঁচায় বন্দি রাখা, মেরে খাওয়া কিংবা শাপলা পাতা মাছ ধরার দৃশ্যগুলো আইন লঙ্ঘনের নজির বলে প্রাণী অধিকারকর্মীরা অভিযোগ তোলেন। এরপর সিনেমাটি দেখে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের বিরুদ্ধে মামলা করে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। এ ছাড়া ‘হাওয়া’র ছাড়পত্র বাতিল এবং প্রদর্শন নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে এক আইনজীবীও পরে উকিল নোটিস পাঠান। এদিকে গত মার্চে নির্মাতা অনন্য ইমনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। কারণ ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডেতে একটি টেলিভিশনে প্রচারিত ‘শেষ গল্পটা তুমি’ নাটকের একটি দৃশ্যে খাঁচায় বন্দি টিয়া পাখি দেখান নির্মাতা।
অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতি আহসান হাবীব নাসিম বলেন, সব ‘ষড়যন্ত্রের’ বিরুদ্ধে শিল্পীরা সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি বলেন, ‘সিনেমা ও নাটক-সংশ্লিষ্ট সব সংগঠন একজোট হয়ে প্রতিবাদ করব। এসব মামলার মধ্য দিয়ে মূলত শিল্প-সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ করার ষড়যন্ত্র। সম্মিলিত প্রতিবাদে এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।’ সংগঠনটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যখন কয়েকজন তরুণ, মেধাবী, শিক্ষিত শিল্পী, নির্মাতার হাত ধরে ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার নতুনভাবে একটু একটু করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করেছে, আবার যখন সিনেমা হলে মানুষের জোয়ার নেমেছে, মানুষ দলে দলে সিনেমা দেখতে আসছে, ঠিক তখনই এ জোয়ার বন্ধ করার ষড়যন্ত্র নিয়ে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এই অশুভ শক্তি বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য জঘন্যতম তৎপরতা চালিয়ে আসছে। এবার তারা আইনের ধারা-উপধারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।’ হাওয়া সিনেমার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘যে হাওয়ায় পুরো বাংলাদেশ ভাসছে, সেই হাওয়াকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের নকশা নিয়ে উপস্থিত। বলা হচ্ছে, হাওয়া চলচ্চিত্রের সব ধরনের প্রদর্শনী বন্ধ করতে হবে। বলা হচ্ছে, বন্য প্রাণী আইন লঙ্ঘন হয়েছে।’ শিল্পী সংঘ বলছে, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আর শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মী মানেই তারা সমাজের ‘সবচেয়ে সচেতন জনগোষ্ঠীর অংশ’।
‘আমরা কখনোই আমাদের সমাজ, পরিবেশ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধ কোনো কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করি না। বরং সব ধরনের সমাজ সচেতনমূলক কর্মকাণ্ডে শিল্পীরাই সর্বাগ্রে সব সময় ভূমিকা পালন করে আসছেন।’ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গল্পের প্রয়োজনেই কখনো কখনো পশু-পাখিদের দেখানো হয় সিনেমায়।
‘নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণে কখনোই শিল্পী-নির্মাতারা পশু-পাখি হত্যা ও নির্যাতন করেন না। যা হাওয়া চলচ্চিত্রে ঘটেছে। জেলেরা গভীর সমুদ্রে হারিয়ে গেলে পাখি ছেড়ে দিয়ে দেখেন কাছাকাছি কোনো স্থলভূমি আছে কি না, যা এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে। এটি জীবনেরই অংশ এবং চলচ্চিত্রে ঘোষণাই দেওয়া হয়েছে এখানে কোনো বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করা হয়নি।’ এর আগেও এমন দৃশ্য নাটক-সিনেমায় দেখানো হয়েছে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জন্মলগ্ন থেকে আমরা বিভিন্ন নাটক-চলচ্চিত্রে দেখে আসছি এমন কত দৃশ্য, সেগুলো নিয়ে আপত্তি উঠল না কেন? সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রযোজিত ভীষণ জনপ্রিয় নাটক ‘বহুব্রীহি’র সেই খাঁচায় বন্দি টিয়া পাখির ‘তুই রাজাকার’ সংলাপ এখনো আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। এমন হাজারো ঘটনায় কর্তৃপক্ষ তখন কোথায় ছিল? চলচ্চিত্র ও টিভি অঙ্গনের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী তাদের ফেইসবুক পেজে এ সম্পর্কে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অভিনেত্রী মৌটুসী বিশ^াস তার ফেইসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘মঙ্গলযাত্রা থেকে সিনেমা… সব যেন বন্ধ করে দিতে চায় এরা। কখনো টিপ তো কখনো খাঁচার পাখিকে এরা ব্যবহার করে আমাদের শেকল পরানোর জন্য। আমরা প্রতিবাদ করব, শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ করে যাব। পারলে ঠ্যাকা। হোক প্রতিবাদ।’ ‘এ ঘটনায় চলচ্চিত্রের প্রযোজক, পরিচালককে ডেকে কথা বলা যেত। আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকলে কীভাবে তা শুধরানো যায় সেই আলোচনা ও পদক্ষেপ নেওয়া যেত। তা না করে অনন্য ইমনের বিরুদ্ধে ১৫ কোটি এবং মেজবাউর রহমান সুমনের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের জন্য আইনি তলব এসবই আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির কণ্ঠ রুদ্ধ করার, শিল্প-সাহিত্যচর্চাকে নিরুৎসাহিত করার ষড়যন্ত্র হিসেবেই আমরা দেখছি।’